গত সপ্তাহে ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য মহারাষ্ট্রের অমরাবতীর একটি সরকারি হাসপাতালে নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) আগুন লেগে তিন নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে।
এর দুই দিন পর পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের অন্যতম প্রধান সরকারি হাসপাতালে প্রসূতি ওয়ার্ডে আগুন লেগে মারা যায় ১৪ নবজাতক।
অমরাবতীতে অগ্নিকাণ্ডের কারণ হিসেবে ত্রুটিপূর্ণ ভেন্টিলেটরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আর ইসলামাবাদে আগুনের সূত্রপাত হয় একটি এয়ারকন্ডিশনার বিস্ফোরণ থেকে।
দুই দেশের সীমান্তের দুই পাশে সন্তান হারানো মা–বাবার হৃদয়বিদারক গল্প একই।
দুই দেশেই বাবা-মায়েরা সরকারি হাসপাতালের বাইরে দাঁড়িয়ে ঘটনার কোনো অর্থ খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করেছেন।
অমরাবতীতে এক বাবা সন্তানের জন্মের আনন্দে তখনো মিষ্টি বিতরণ করছিলেন। তিনি তখনো নিজের সন্তানের মুখ দেখেননি। ইসলামাবাদে একটি পরিবার বহু বছর পর প্রথম পুত্রসন্তানের জন্ম উদ্যাপন করছিল।
পরিস্থিতি আলাদা হলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা এবং সরকারি প্রতিক্রিয়ায় ছিল একই চিত্র। উদ্ধারকারী দল দেরিতে পৌঁছেছে।
আরও পড়ুন
যুদ্ধ বাধলে পাকিস্তান ও ভারত— কার কী ক্ষতি হবে
০৩ মে ২০২৫
যুদ্ধ বাধলে পাকিস্তান ও ভারত— কার কী ক্ষতি হবে
আরও পড়ুন
পাকিস্তান, ভারত ও শ্রীলঙ্কার তুলনায় বাংলাদেশ
১৬ জুলাই ২০২৪
পাকিস্তান, ভারত ও শ্রীলঙ্কার তুলনায় বাংলাদেশ
জরুরি রোগী সরিয়ে নেওয়ার কাজও ব্যাহত হয়েছে হাসপাতালের মৌলিক অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতির কারণে।
রাজনীতিকেরা দ্রুত শোক প্রকাশ করেছেন। উচ্চপর্যায়ের তদন্তের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। দেওয়া হয়েছে আর্থিক ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি। অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার নিরীক্ষার কথাও বলা হয়েছে।
কিন্তু আগুনের ধোঁয়া মিলিয়ে যাওয়ার পর এই দুই ঘটনা একটি অত্যন্ত লজ্জাজনক সত্য সামনে আনে। দুই দেশেই দরিদ্র ও অসহায় পরিবারের মানুষের জীবনকে যেন সহজেই বিসর্জন দেওয়া যায়।
ক্রিকেট, সামরিক শক্তি প্রদর্শন এবং কূটনৈতিক কথার লড়াইয়ে ভারত ও পাকিস্তান পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনকে পকেটের খুচরো পয়সার মতো খরচ করার ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে আশ্চর্য মিল রয়েছে।
২৬ বছর ধরে স্বাস্থ্যবিষয়ক সাংবাদিক হিসেবে আমি ভারত ও পাকিস্তানে হাসপাতালের অগ্নিকাণ্ড দেখেছি। বারবার এসব ঘটনায় বিপুল প্রাণহানি ঘটেছে। কিন্তু এসব হাসপাতালের নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন হয়নি।
মহারাষ্ট্রের অমরাবতী জেলার একটি সরকারি হাসপাতালের নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) আগুনে অন্তত তিন নবজাতকের মৃত্যু হয়। ঘটনার পর পুড়ে যাওয়া চিকিৎসা সরঞ্জামের ধ্বংসাবশেষ।
মহারাষ্ট্রের অমরাবতী জেলার একটি সরকারি হাসপাতালের নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) আগুনে অন্তত তিন নবজাতকের মৃত্যু হয়। ঘটনার পর পুড়ে যাওয়া চিকিৎসা সরঞ্জামের ধ্বংসাবশেষ।ছবি: পিটিআই
ভারতে ২০১১ সালে এএমআরআই হাসপাতালে আগুনে ৮৯ জন মারা যান। ২০১৬ সালে ভুবনেশ্বরের এসইউএম হাসপাতালে আগুনে মারা যান ২৪ জন।
এসব ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদন লেখা ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক। অথচ এসব ঘটনায় একজনকেও দোষী সাব্যস্ত করা হয়নি।
পাকিস্তানেও একই চিত্র। ২০১২ সালে লাহোরের সার্ভিসেস হাসপাতালে আগুনে ১০ নবজাতকের মৃত্যু হয়। ২০২৪ সালে সাহিওয়াল টিচিং হাসপাতালে আগুনে মারা যায় আরও ১১ শিশু।
এই পুরোনো ঘটনাগুলো আমার মনে পড়ছে; কারণ, অমরাবতী ও ইসলামাবাদের সর্বশেষ আগুনকে শুধু ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রপাতি বা কোনো ব্যক্তির অবহেলার ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এসব আগুন কোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাসপাতালে লাগেনি।
একটি ঘটনা ঘটেছে ভারতের সবচেয়ে ধনী রাজ্যে, অন্যটি ঘটেছে পাকিস্তানের রাজধানীতে।
সরকারি তথ্য যত গভীরভাবে দেখা যায়, চিত্র ততই ভয়াবহ হয়ে ওঠে। বছরের পর বছর ভারত ও পাকিস্তান নিজেদের নাগরিকদের আগুনের হাতে তুলে দিচ্ছে। যেন মধ্যযুগের সমাজের মতো উদাসীন কোনো দেবতাকে সন্তুষ্ট করতে মানুষ বলি দেওয়া হচ্ছে।















