০৯:১৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

গুমের অপরাধীদের বিচার ও সঠিক আইন প্রণয়নের দাবি

  • রিপোর্টার
  • আপডেট সময় : ০২:৩৭:২৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৫৪ Time View

গুমের অপরাধীদের কোনো ধরনের সুরক্ষা না দিয়ে অবিলম্বে তাদের বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সঠিক আইন প্রণয়ন করতে হবে। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর গুমের মতো ভয়াবহ অপরাধের বিচার কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও এখন এমন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যা উল্টো অপরাধীদের রক্ষার পথ তৈরি করতে পারে।

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) আয়োজিত ‘শুনতে কী পাও?’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব কথা উঠে আসে। সোমবার বেলা তিনটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার মিলনায়তনে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে আইনজ্ঞ, মানবাধিকারকর্মীসহ গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন। আলোচনা শেষে চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা হয়।

আলোচনা সভায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর গুমের মতো ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে আলোচনা করার কথা ছিল না। অপরাধীদের বিচার ও শাস্তি কার্যকর হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু এখন আবার এমন আইন করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যা গুমের অপরাধীদের সুরক্ষা দিতে পারে।

আইনের দুর্বলতা তুলে ধরে তাজুল ইসলাম বলেন, গুম প্রতিরোধ আইনের ১৪ ধারায় বলা হয়েছে, যে বাহিনী অপরাধ করবে, সেই বাহিনী ছাড়া অন্য বাহিনী তদন্ত করবে। কিন্তু গুমের ঘটনায় এক বাহিনী অন্য বাহিনীর পরিচয় ব্যবহার করেছে এবং এক বাহিনী অন্য বাহিনীর কাছে ভুক্তভোগীকে হস্তান্তর করেছে। ফলে কোন বাহিনী অপরাধ করেছে, তা নির্ধারণ করাই কঠিন। এ কারণে আইনটি বাস্তবে অকার্যকর হতে পারে।

বর্তমান সরকারকে সঠিক আইন প্রণয়ন ও গুমের অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তাজুল ইসলাম। একই সঙ্গে সরকারি দল ও বিরোধী দলকে দায়িত্বশীল আচরণ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যারা ৩৬ জুলাইয়ের মহাবিপ্লব ঘটাতে পেরেছে, তারা প্রয়োজনে বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বকেও জবাবদিহির মুখোমুখি করতে পারে।’

‘স্বজনেরা কি বেঁচে আছেন’

মানবাধিকারকর্মী ও আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সাবেক প্রধান নূর খান লিটন বলেন, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশ নতুন এক পথচলা শুরু করলেও গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর মনে এখনো একটিই প্রশ্ন—তাঁদের স্বজনেরা কি বেঁচে আছেন? গুম কমিশনের মাধ্যমে কিছু ঘটনার আভাস পাওয়া গেলেও এখন পর্যন্ত কোনোটিরই সুষ্ঠু বিচার সম্পন্ন হয়নি।

নূর খান বলেন, গুমের ঘটনাগুলো ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। ডিবি, র্যাব বা ডিজিএফআই পরিচয়ে ব্যক্তিদের তুলে নেওয়া হতো; কিন্তু আজ পর্যন্ত এসব ঘটনার হোতাদের বিচারের মুখোমুখি করা সম্ভব হয়নি।

গুম কমিশন বা মানবাধিকার কমিশনের জন্য প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে অনেক ত্রুটি রয়েছে উল্লেখ করে এই মানবাধিকারকর্মী বলেন, অধ্যাদেশে ‘আন্তঃবাহিনী তদন্তের’ যে কথা বলা হচ্ছে, তাতে ন্যায়বিচার পাওয়া অসম্ভব। যে বাহিনী অপরাধের সঙ্গে জড়িত, তাদের মাধ্যমেই তদন্ত করা হলে সত্য কখনো বেরিয়ে আসবে না।

ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাসেম বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার ৫৪ বছর পার হলেও আমরা আজও গুমের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়তে পারিনি। যেসব আইন বা কমিশন গঠন করা হচ্ছে, সেগুলো যদি কেবল কাগজে-কলমে থাকে এবং বাস্তবে জনগণের অধিকার রক্ষায় ‘বিকলাঙ্গ’ হয়ে পড়ে, তবে তার কোনো মূল্য নেই। একজন ভুক্তভোগী হিসেবে এমন প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা রাখা কঠিন।

‘ভাই জীবিত থাকলে ফিরিয়ে দিন, না হলে লাশ দিন’

গুমের শিকার হাফেজ জাকির হোসেনের বড় ভাই মতিউর রহমান বলেন, ২০১৩ সালের ৩ এপ্রিল র্যাব-২ পরিচয়ে তাঁর ভাইকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরবর্তী তিন দিন তিনি ঢাকার ৪৮টি থানাসহ সম্ভাব্য সব জায়গায় তাঁকে খুঁজেছেন; কিন্তু কোনো সন্ধান পাননি। ডিবি কার্যালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে স্মারকলিপি দিয়েও কোনো লাভ হয়নি।

মতিউর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে মামলা চললেও তাঁরা এখন পর্যন্ত জাকিরের কোনো সুনির্দিষ্ট খোঁজ পাননি। বর্তমান সরকারের কাছে তাঁর আকুল আবেদন, তাঁর ভাই জীবিত থাকলে তাঁকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হোক। আর যদি তাঁকে হত্যা করা হয়ে থাকে, তবে অন্তত তাঁর লাশটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হোক।

আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, পিএইচডি গবেষক নওশীন শর্মিলা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েম ও ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য মো. শাহিনুর রহমান।

আলোচনা শেষে ‘জোয়ার’ চলচ্চিত্রটি প্রদর্শন করা হয়। চলচ্চিত্রটি ২০২৫ সালের যুক্তরাষ্ট্রের নর্থওয়েস্ট ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের (এনআইএফএফ) অফিশিয়াল মনোনয়ন পেয়েছে। এ ছাড়া ২০২৬ সালের বগুড়া আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে এটি সেরা জাতীয় স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের পুরস্কার পেয়েছে।

Tag :
About Author Information

জনপ্রিয় নিউজ

গুমের অপরাধীদের বিচার ও সঠিক আইন প্রণয়নের দাবি

আপডেট সময় : ০২:৩৭:২৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গুমের অপরাধীদের কোনো ধরনের সুরক্ষা না দিয়ে অবিলম্বে তাদের বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সঠিক আইন প্রণয়ন করতে হবে। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর গুমের মতো ভয়াবহ অপরাধের বিচার কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও এখন এমন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যা উল্টো অপরাধীদের রক্ষার পথ তৈরি করতে পারে।

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) আয়োজিত ‘শুনতে কী পাও?’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব কথা উঠে আসে। সোমবার বেলা তিনটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার মিলনায়তনে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে আইনজ্ঞ, মানবাধিকারকর্মীসহ গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন। আলোচনা শেষে চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা হয়।

আলোচনা সভায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর গুমের মতো ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে আলোচনা করার কথা ছিল না। অপরাধীদের বিচার ও শাস্তি কার্যকর হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু এখন আবার এমন আইন করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যা গুমের অপরাধীদের সুরক্ষা দিতে পারে।

আইনের দুর্বলতা তুলে ধরে তাজুল ইসলাম বলেন, গুম প্রতিরোধ আইনের ১৪ ধারায় বলা হয়েছে, যে বাহিনী অপরাধ করবে, সেই বাহিনী ছাড়া অন্য বাহিনী তদন্ত করবে। কিন্তু গুমের ঘটনায় এক বাহিনী অন্য বাহিনীর পরিচয় ব্যবহার করেছে এবং এক বাহিনী অন্য বাহিনীর কাছে ভুক্তভোগীকে হস্তান্তর করেছে। ফলে কোন বাহিনী অপরাধ করেছে, তা নির্ধারণ করাই কঠিন। এ কারণে আইনটি বাস্তবে অকার্যকর হতে পারে।

বর্তমান সরকারকে সঠিক আইন প্রণয়ন ও গুমের অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তাজুল ইসলাম। একই সঙ্গে সরকারি দল ও বিরোধী দলকে দায়িত্বশীল আচরণ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যারা ৩৬ জুলাইয়ের মহাবিপ্লব ঘটাতে পেরেছে, তারা প্রয়োজনে বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বকেও জবাবদিহির মুখোমুখি করতে পারে।’

‘স্বজনেরা কি বেঁচে আছেন’

মানবাধিকারকর্মী ও আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সাবেক প্রধান নূর খান লিটন বলেন, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশ নতুন এক পথচলা শুরু করলেও গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর মনে এখনো একটিই প্রশ্ন—তাঁদের স্বজনেরা কি বেঁচে আছেন? গুম কমিশনের মাধ্যমে কিছু ঘটনার আভাস পাওয়া গেলেও এখন পর্যন্ত কোনোটিরই সুষ্ঠু বিচার সম্পন্ন হয়নি।

নূর খান বলেন, গুমের ঘটনাগুলো ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। ডিবি, র্যাব বা ডিজিএফআই পরিচয়ে ব্যক্তিদের তুলে নেওয়া হতো; কিন্তু আজ পর্যন্ত এসব ঘটনার হোতাদের বিচারের মুখোমুখি করা সম্ভব হয়নি।

গুম কমিশন বা মানবাধিকার কমিশনের জন্য প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে অনেক ত্রুটি রয়েছে উল্লেখ করে এই মানবাধিকারকর্মী বলেন, অধ্যাদেশে ‘আন্তঃবাহিনী তদন্তের’ যে কথা বলা হচ্ছে, তাতে ন্যায়বিচার পাওয়া অসম্ভব। যে বাহিনী অপরাধের সঙ্গে জড়িত, তাদের মাধ্যমেই তদন্ত করা হলে সত্য কখনো বেরিয়ে আসবে না।

ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাসেম বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার ৫৪ বছর পার হলেও আমরা আজও গুমের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়তে পারিনি। যেসব আইন বা কমিশন গঠন করা হচ্ছে, সেগুলো যদি কেবল কাগজে-কলমে থাকে এবং বাস্তবে জনগণের অধিকার রক্ষায় ‘বিকলাঙ্গ’ হয়ে পড়ে, তবে তার কোনো মূল্য নেই। একজন ভুক্তভোগী হিসেবে এমন প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা রাখা কঠিন।

‘ভাই জীবিত থাকলে ফিরিয়ে দিন, না হলে লাশ দিন’

গুমের শিকার হাফেজ জাকির হোসেনের বড় ভাই মতিউর রহমান বলেন, ২০১৩ সালের ৩ এপ্রিল র্যাব-২ পরিচয়ে তাঁর ভাইকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরবর্তী তিন দিন তিনি ঢাকার ৪৮টি থানাসহ সম্ভাব্য সব জায়গায় তাঁকে খুঁজেছেন; কিন্তু কোনো সন্ধান পাননি। ডিবি কার্যালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে স্মারকলিপি দিয়েও কোনো লাভ হয়নি।

মতিউর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে মামলা চললেও তাঁরা এখন পর্যন্ত জাকিরের কোনো সুনির্দিষ্ট খোঁজ পাননি। বর্তমান সরকারের কাছে তাঁর আকুল আবেদন, তাঁর ভাই জীবিত থাকলে তাঁকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হোক। আর যদি তাঁকে হত্যা করা হয়ে থাকে, তবে অন্তত তাঁর লাশটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হোক।

আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, পিএইচডি গবেষক নওশীন শর্মিলা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েম ও ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য মো. শাহিনুর রহমান।

আলোচনা শেষে ‘জোয়ার’ চলচ্চিত্রটি প্রদর্শন করা হয়। চলচ্চিত্রটি ২০২৫ সালের যুক্তরাষ্ট্রের নর্থওয়েস্ট ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের (এনআইএফএফ) অফিশিয়াল মনোনয়ন পেয়েছে। এ ছাড়া ২০২৬ সালের বগুড়া আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে এটি সেরা জাতীয় স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের পুরস্কার পেয়েছে।