গতকাল পালিত হলো আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। বাংলাদেশের জন্যও দিবসটি ছিল বিগত আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার নির্মম অপব্যবহার ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক বেদনার্দ ইতিহাসকে স্মরণের দিন। বিগত দেড় দশকের স্বৈরাচারী শাসনকালে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন ও ভিন্নমতকে পুরোপুরি স্তব্ধ করতে ‘গুম’কে একটি ভীতিপ্রদ অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছিল। গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের অনুসন্ধানে প্রাপ্ত ১ হাজার ৫৬৯টি গুমের সত্যতা এবং ২৫১ জনের আজও হদিস না মেলার চিত্র স্পষ্ট করে দেয়, এই অপরাধ বাংলাদেশে কতটা সুপরিকল্পিত ও ব্যাপকভাবে বিস্তৃত ছিল। রাষ্ট্রীয় বিশেষ বাহিনীকে ব্যবহার করে ডিজিটাল নজরদারি ও গোপন বন্দিশালার এক ভয়াল কাঠামোর মধ্য দিয়ে এই অমানবিক প্রক্রিয়া পরিচালনা করা হয়েছে।
বলা বাহুল্য, একুশ শতকের এই সময়ে দাঁড়িয়ে কোনো সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের স্থান হতে পারে না। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গুমের বিচার ও নিবারণে যে নতুন ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন’ প্রস্তাব করা হয়েছে, তাতে বেশকিছু গুরুতর ত্রুটি প্রকাশ পাওয়ায় তা সচেতন নাগরিক মহলকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। তাদের মতে, যে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ থাকবে, সেই বাহিনীকেই যদি আবার তদন্তের এখতিয়ার দেওয়া হয়, তবে ন্যায়বিচার চিরতরে বাধাগ্রস্ত হতে বাধ্য। কারণ অতীতে দেখা গেছে, কীভাবে অপরাধীদের রক্ষা করতে গিয়ে আলামত বিনষ্টের চেষ্টা করা হয়েছে। একইসঙ্গে অভিযোগ প্রমাণিত না হলে অভিযোগকারীকেই কারাদণ্ডের মুখোমুখি করার যে বিধান যুক্ত রাখা হয়েছে, তা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে আইনি প্রতিকার চাওয়া থেকে মারাত্মকভাবে নিরুৎসাহিত করবে।
আমরা মনে করি, গুমের মতো নিষ্ঠুর অপরাধ দেশ থেকে চিরতরে নির্মূল করতে হলে রাষ্ট্রকে অবশ্যই পূর্ণ জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। প্রস্তাবিত আইনে অনতিবিলম্বে জরুরি সংশোধন এনে গুমের যে কোনো ধরনের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট বাহিনীর হাত থেকে সরিয়ে নিরপেক্ষ ও স্বাধীন কোনো তৃতীয় সংস্থা বা শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশনের অধীনে ন্যস্ত করা বাঞ্ছনীয়। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ওপর কঠোর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আইনি পরিকাঠামো গড়ে তোলা এবং অতীতে ঘটে যাওয়া প্রতিটি গুমের নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করাই হোক সভ্য সমাজ গঠনের একমাত্র অঙ্গীকার।


















