০৭:২১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

করিডর ব্যবহারে দিল্লির তাগাদা

  • রিপোর্টার
  • আপডেট সময় : ০২:১৪:৫২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৪৮ Time View

বাংলাদেশের ভূমি (করিডর) ব্যবহার করে ভারতের হাইভোল্টেজ বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণের বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। শুক্রবার যুগান্তরের খবরে প্রকাশ-ভারতের আসাম রাজ্যের বরনগর থেকে বিহারের কাটিহার পর্যন্ত ৭৬৫ কেভি হাইভোল্টেজ বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণের ব্যাপারে ঢাকাকে তাগাদা দিচ্ছে দিল্লি।

এ ব্যাপারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিদ্যুৎ বিভাগ বেশকিছু কাগজপত্র তৈরি করেছে বলেও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বিষয়টিতে যদি সরকার সায় দেয়, তবে দেশের পার্বতীপুর দিয়ে ৭৫ থেকে ৮০ কিলোমিটার ভূখণ্ড বা করিডর ব্যবহারের সুযোগ পাবে ভারত। স্বাভাবিকভাবেই করিডর ব্যবহারের বিষয়ে ভারতের পুনর্ব্যক্ত দাবিটি একটি স্পর্শকাতর, কৌশলগত, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় বিদ্যুৎ পরিবহণে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহারের এই মেগা পরিকল্পনায় আপাতদৃষ্টিতে আঞ্চলিক সহযোগিতার কথা বলা হলেও এর নেপথ্যে রয়েছে দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা, নদীর স্বাভাবিক নাব্য, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং ভূ-রাজনৈতিক হিসাবনিকাশ।

প্রস্তাবিত এই সঞ্চালন লাইনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাটি হলো ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকায় ভারতের পরিকল্পিত ও বাস্তবায়নাধীন একাধিক বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। উজানে একের পর এক বাঁধ নির্মাণ করে নদ-নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ আটকে রাখলে কিংবা গতিপথ পরিবর্তিত করলে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি, নদ-নদীর জীববৈচিত্র্য ও সামগ্রিক জনজীবন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রস্তাবিত সঞ্চালন লাইন দিয়ে যদি শুষ্ক মৌসুমে নদী নিয়ন্ত্রণ করে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়, তাহলে ভূখণ্ড ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে বাংলাদেশ প্রকৃতপক্ষে নিজের পরিবেশগত বিপর্যয়কেই ত্বরান্বিত করবে। তাই ভারতের কাছ থেকে এই লাইনের বিদ্যুৎ উৎসের বিষয়ে পুরোপুরি স্পষ্ট ব্যাখ্যা আদায় করা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের মেকং নদী কমিশনের আদলে চীন, ভারত, ভুটান ও বাংলাদেশকে যুক্ত করে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় যৌথ নদী সমীক্ষা পরিচালনা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।

আমরা মনে করি, প্রতিবেশী দেশ নেপাল ও ভুটান থেকে সরাসরি সস্তায় জলবিদ্যুৎ আমদানির স্বার্থে একটি স্বাধীন ও আলাদা বহুপক্ষীয় গ্রিড লাইনের সুযোগ আদায় করা ঢাকার জন্য অপরিহার্য। কেবল ভারতের প্রস্তাবিত ৭৬৫ কেভি লাইনের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল থাকলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যে বাংলাদেশের দরকষাকষির সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়তে পারে। তাছাড়া এই সঞ্চালন লাইন দিয়ে বাংলাদেশ ঠিক কী পরিমাণ বিদ্যুৎ স্থায়ীভাবে এবং কী দামে আমদানি করতে পারবে, তা সম্মতির শুরুতেই স্পষ্ট করা প্রয়োজন। ভুলে গেলে চলবে না, দ্বিপক্ষীয় আলোচনা এগিয়ে নিতে সাময়িক বাণিজ্যিক সুবিধার চেয়ে দেশের স্বার্থ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া বাঞ্ছনীয়। কোনো সুনির্দিষ্ট আর্থিক লাভ-ক্ষতি ও সার্বিক পরিবেশগত প্রভাবের নিরপেক্ষ সমীক্ষা ছাড়া নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া কোনোভাবেই সমীচীন হবে না। কাজেই আন্তর্জাতিক এই বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়ার আগে বাংলাদেশের জন্য নিরপেক্ষ কারিগরি, আর্থিক ও টেকসই পরিবেশগত পর্যালোচনা আবশ্যক। জাতীয় স্বার্থকে পুরোপুরি সুরক্ষিত রেখে সরকার এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে, এটাই প্রত্যাশা।

Tag :
About Author Information

জনপ্রিয় নিউজ

করিডর ব্যবহারে দিল্লির তাগাদা

আপডেট সময় : ০২:১৪:৫২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশের ভূমি (করিডর) ব্যবহার করে ভারতের হাইভোল্টেজ বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণের বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। শুক্রবার যুগান্তরের খবরে প্রকাশ-ভারতের আসাম রাজ্যের বরনগর থেকে বিহারের কাটিহার পর্যন্ত ৭৬৫ কেভি হাইভোল্টেজ বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণের ব্যাপারে ঢাকাকে তাগাদা দিচ্ছে দিল্লি।

এ ব্যাপারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিদ্যুৎ বিভাগ বেশকিছু কাগজপত্র তৈরি করেছে বলেও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বিষয়টিতে যদি সরকার সায় দেয়, তবে দেশের পার্বতীপুর দিয়ে ৭৫ থেকে ৮০ কিলোমিটার ভূখণ্ড বা করিডর ব্যবহারের সুযোগ পাবে ভারত। স্বাভাবিকভাবেই করিডর ব্যবহারের বিষয়ে ভারতের পুনর্ব্যক্ত দাবিটি একটি স্পর্শকাতর, কৌশলগত, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় বিদ্যুৎ পরিবহণে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহারের এই মেগা পরিকল্পনায় আপাতদৃষ্টিতে আঞ্চলিক সহযোগিতার কথা বলা হলেও এর নেপথ্যে রয়েছে দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা, নদীর স্বাভাবিক নাব্য, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং ভূ-রাজনৈতিক হিসাবনিকাশ।

প্রস্তাবিত এই সঞ্চালন লাইনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাটি হলো ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকায় ভারতের পরিকল্পিত ও বাস্তবায়নাধীন একাধিক বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। উজানে একের পর এক বাঁধ নির্মাণ করে নদ-নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ আটকে রাখলে কিংবা গতিপথ পরিবর্তিত করলে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি, নদ-নদীর জীববৈচিত্র্য ও সামগ্রিক জনজীবন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রস্তাবিত সঞ্চালন লাইন দিয়ে যদি শুষ্ক মৌসুমে নদী নিয়ন্ত্রণ করে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়, তাহলে ভূখণ্ড ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে বাংলাদেশ প্রকৃতপক্ষে নিজের পরিবেশগত বিপর্যয়কেই ত্বরান্বিত করবে। তাই ভারতের কাছ থেকে এই লাইনের বিদ্যুৎ উৎসের বিষয়ে পুরোপুরি স্পষ্ট ব্যাখ্যা আদায় করা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের মেকং নদী কমিশনের আদলে চীন, ভারত, ভুটান ও বাংলাদেশকে যুক্ত করে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় যৌথ নদী সমীক্ষা পরিচালনা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।

আমরা মনে করি, প্রতিবেশী দেশ নেপাল ও ভুটান থেকে সরাসরি সস্তায় জলবিদ্যুৎ আমদানির স্বার্থে একটি স্বাধীন ও আলাদা বহুপক্ষীয় গ্রিড লাইনের সুযোগ আদায় করা ঢাকার জন্য অপরিহার্য। কেবল ভারতের প্রস্তাবিত ৭৬৫ কেভি লাইনের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল থাকলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যে বাংলাদেশের দরকষাকষির সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়তে পারে। তাছাড়া এই সঞ্চালন লাইন দিয়ে বাংলাদেশ ঠিক কী পরিমাণ বিদ্যুৎ স্থায়ীভাবে এবং কী দামে আমদানি করতে পারবে, তা সম্মতির শুরুতেই স্পষ্ট করা প্রয়োজন। ভুলে গেলে চলবে না, দ্বিপক্ষীয় আলোচনা এগিয়ে নিতে সাময়িক বাণিজ্যিক সুবিধার চেয়ে দেশের স্বার্থ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া বাঞ্ছনীয়। কোনো সুনির্দিষ্ট আর্থিক লাভ-ক্ষতি ও সার্বিক পরিবেশগত প্রভাবের নিরপেক্ষ সমীক্ষা ছাড়া নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া কোনোভাবেই সমীচীন হবে না। কাজেই আন্তর্জাতিক এই বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়ার আগে বাংলাদেশের জন্য নিরপেক্ষ কারিগরি, আর্থিক ও টেকসই পরিবেশগত পর্যালোচনা আবশ্যক। জাতীয় স্বার্থকে পুরোপুরি সুরক্ষিত রেখে সরকার এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে, এটাই প্রত্যাশা।