বিদ্যমান জ্বালানি সংকট কেবল জনজীবনকেই বিপর্যস্ত করছে না; দেশের ছোট, মাঝারি, বড়-সব শিল্পেই অর্থাৎ প্রায় পুরো শিল্প খাতেই এর প্রভাব পড়ছে। ফলে এ সংকট দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভারত থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান আদানি গ্রুপের খামখেয়ালি আচরণ, যা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে। গতকাল যুগান্তরে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত দুটি ভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্যগুলো দেশের অর্থনীতির জন্য এক অশনিসংকেত।
রোববার মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে জ্বালানি সংকটের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে সারা দেশের শিল্পকারখানাগুলোতে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধি ৩.৭১ শতাংশ থেকে কমে ২.৮৬ শতাংশে নেমে এসেছে। নতুন গ্যাস সংযোগের অভাবে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ আটকে আছে। নরসিংদী, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে শত শত কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে অথবা সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম উৎপাদনে চলছে। আমাদের জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা গত ৪ বছরে ৪৭.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬২.৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের যে কোনো অস্থিরতা সরাসরি আমাদের অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।
শিল্প খাতের এই ত্রাহি অবস্থার মধ্যেই ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে ভারতের আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ সরবরাহ হ্রাস পাওয়া। তীব্র গরমে যখন দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ব্যাপক, তখন গত ২৩ দিন ধরে আদানি গ্রুপ তাদের উৎপাদনক্ষমতার প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের কেন্দ্র থেকে যেখানে ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা, সেখানে মিলছে মাত্র ৭৯০ থেকে ৯১৫ মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বারবার চিঠি দিলেও কয়লা ভিজে যাওয়া বা রেললাইন নষ্ট হওয়ার যুক্তি দেখানো হচ্ছে।
এই বহুমুখী সংকট থেকে উত্তরণে এখন আর জোড়াতালি দেওয়া পদক্ষেপে কাজ হবে না। প্রথমত, শিল্প খাতকে বাঁচাতে হলে জ্বালানি সরবরাহে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দেশের অর্থনীতির স্বার্থে প্রয়োজনে লোড ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এনে কারখানাগুলোকে উৎপাদনের সুযোগ দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি ও পূর্বানুমানযোগ্য একটি জ্বালানি নীতি প্রণয়ন করতে হবে। তৃতীয়ত, জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর সর্বোচ্চ জোর দিতে হবে। চতুর্থত, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে করা অসম ও বিতর্কিত চুক্তিগুলো আইনি কাঠামোর মধ্যে পুনর্মূল্যায়ন করার সময় এসেছে। দেশের মানুষের করের টাকায় নিয়মিত বিল পরিশোধ করে আমরা কোনো বিদেশি কোম্পানির খামখেয়ালিপনার শিকার হতে পারি না। জাতীয় স্বার্থ রক্ষা, বিনিয়োগ সুরক্ষা এবং অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে স্বচ্ছ ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। নয়তো উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ-সবকিছুই এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে, যার মাশুল দিতে হবে পুরো জাতিকে।


















