থানা, আদালত চত্বর কিংবা প্রিজনভ্যান-আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তাবলয় ভেদ করে আসামিদের বারবার পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা বর্তমানে এক ভয়াবহ উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি যাত্রাবাড়ী থানায় হত্যা মামলার আসামি মিতু আক্তারের পুলিশ হেফাজত থেকে চম্পট দেওয়া এবং চলতি বছরসহ বিগত বছরগুলোতে অনেক আসামির পলায়ন আমাদের বিচার ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার একটি খারাপ অবস্থাকেই প্রকাশ করে দিয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে রেকর্ড ১২ জন এবং ২০২৪ ও ২০২৩ সালেও একাধিক দুর্ধর্ষ আসামি পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়েছে।
আইন রক্ষকদের হেফাজতে থাকা আসামির উধাও হয়ে যাওয়া কেবল একটি বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; এটি গোটা পুলিশ বাহিনীর পেশাদারত্ব, সক্ষমতা ও তদারকির অভাবকে প্রকট করে। অনুসন্ধানে দেখা যায়-আদালতে হাজিরা, প্রিজনভ্যানে তোলা বা হস্তান্তরের সময় নিরাপত্তাব্যবস্থায় মারাত্মক ফাঁকফোকর থাকে। এর পাশাপাশি অপর্যাপ্ত সদস্য, হাতকড়া ও প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা সরঞ্জামের ত্রুটি এবং দায়িত্বপ্রাপ্তদের ভয়াবহ অসতর্কতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে অনৈতিক আঁতাত ও যোগসাজশের গুরুতর অভিযোগও নাকচ করা যায় না।
হেফাজত থেকে আসামি পালানোর পরিণতি অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। এটি বিচারপ্রক্রিয়া ও তদন্তকে শুধু বিলম্বিতই করে না, বরং ভুক্তভোগী, বাদী ও মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের জীবনকেও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়। অপরাধীরা পালিয়ে নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করলে বিচারব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা একেবারে ভেঙে পড়ে।
এ ধরনের ঘটনা ঘটলে কয়েকজন নিম্নপদস্থ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত বা প্রত্যাহার করেই দায়িত্ব শেষ করা হয়। কিন্তু এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। একে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা না ভেবে শিকড় থেকে উৎখাত করতে হবে। আসামি আনা-নেওয়ার পুরো প্রটোকল আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করা অত্যন্ত জরুরি। নিয়মিত প্রশিক্ষণ, আধুনিক নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার এবং পুলিশ, আদালত ও কারা কর্তৃপক্ষের মধ্যে দ্রুত যোগাযোগ ও সমন্বয় জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি, অসতর্কতা কিংবা যোগসাজশের প্রমাণ মিললে কঠোর বিভাগীয় ও আইনি শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জনগণের আস্থা অর্জন করতে না পারলে বিচারব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে। আসামি পলায়নের মতো ঘটনা বন্ধ করতে হলে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।


















